করোনা সংকটকালে শিক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের সম্মানী নিয়ে কিছু কথা

963
করোনা সংকটকালে শিক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের সম্মানী নিয়ে কিছু কথা
মো. শরীফ উদ্দিন : করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সারা পৃথিবী এখন অনেকটাই স্থবির! জীবনের নিরাপত্তার জন্য পৃথিবীর মানুষদের একটি বিরাট অংশ এখন গৃহবন্দী। বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়েছে ব্যাপকভাবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও চলছে জায়গায় জায়গায় লকডাউন! গত ১৮ মার্চ থেকে দেশে চলছে সাধারণ ছুটি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। পরিস্থিতির বিবেচনায় ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।
পৃথিবীজুড়ে অর্থনৈতিক সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আমেরিকার মতো মহা ক্ষমতাধর রাষ্ট্র পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ! এমতাবস্থায় চলমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক জননেত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষদের প্রণোদনা ঘোষণা করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে খুবই ইতিবাচক পদক্ষেপ। সেজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের শিক্ষক সমাজও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার আওতায় থাকবে আশা করি।

——————————————————————-

📌📌শিক্ষা সম্পর্কিত খবরাখবর জানতে এখানে ক্লিক করে শিক্ষা গ্রুপে ঢুকে JOIN GROUP এ  ক্লিক করুন।গ্রুপে আপনিও শেয়ার করুন…

——————————————————————-

👉👉দৈনন্দিন শিক্ষা সম্পর্কিত খবরাখবর পেতে এখানে ক্লিক করে দৈনিক শিক্ষা সংবাদ পেইজে ঢুকে ” LIKE PAGE ” 👍 এ লাইক দিন

——————————————————————-

আমরা যারা শিক্ষকতা পেশায় জড়িত উত্তরপত্র মূল্যায়ন আমাদের অনেকটা রুটিন কাজ। চলমান করোনা সংকটকালে এই শিক্ষক সমাজের একটি বাড়তি প্রনোদনা হতে পারতো ২০১৯ সালের এইচএসসি পরীক্ষার সম্মানী! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘ এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরে চলমান সংকটকালেও সিলেটের শিক্ষকরা এখনো পায়নি তাদের সম্মানীর টাকা।
জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষার সম্মানীও  দেয়া হয় একই রীতিতে। কিন্তু  এক বছর পর কেন সম্মানীর টাকা দিতে হবে? ফলাফল প্রকাশের পরে সম্মানীর টাকা দিতে সমস্যা কোথায়? যেহেতু ভুলভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের কারণে সম্মানীর টাকা কর্তনের বিধান রয়েছে সেহেতু সর্বোচ্চ পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত সময় নেয়া যেতে পারে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে ফলাফল প্রকাশের আরো এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরে শিক্ষকদের সম্মানী দেয়ার রীতি আমার বোধগম্য হয় না!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সর্বক্ষেত্রে এখন ডিজিটালের হাতছানি। ডিজিটাল পদ্ধতিতে এখন কাজগুলোকে অনেক দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। সে ক্ষেত্রে আমাদের বোর্ডগুলো শিক্ষকদের সম্মানী দেয়ার ক্ষেত্রে এত পিছিয়ে কেন? আমাদের প্রত্যেকের একটি ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্ট থাকার পরেও সিলেট শিক্ষাবোর্ডের অধীন শিক্ষকদের বাধ্যতামূলকভাবে সোনালী ব্যাংকে একাউন্ট খোলা হয়। কয়েকবছর আগে দ্রুততর সময়ের মধ্যে টাকা দেয়ার কথা বলে শিওর ক্যাশের একাউন্ট করতে আবারো বাধ্য করা হয়। এতসবের পরে আগের নিয়মেই এক বছরের বেশি লাগছে সময়!
২০১৯ সালের এইচএসসি পরীক্ষা আরম্ভ হয় সে বছরের এপ্রিল মাসে। ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই। সিলেট  শিক্ষাবোর্ডের পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালের আগস্টের ১৬ তারিখে। এরপর পরীক্ষার আর কোনো কার্যক্রম আছে কিনা আমার জানা নেই। পরীক্ষার্থীদের টাকা বোর্ডে জমা হয় এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। ২০২০ সালের এপ্রিল পেরিয়েও শিক্ষকদের হাতে আসেনি সম্মানীর টাকা। বছরে বছরে বোর্ড ফি বাড়লেও বেশ কয়েকবছর ধরে বাড়ছেনা শিক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের সম্মানী।
গত ৩০ এপ্রিল মৌলভীবাজারের তৈয়বুন্নেছা খানম সরকারি কলেজের শিক্ষক কিশোর চক্রবর্তী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আক্ষেপ করে একটি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “২০১৯ খ্রিস্টাব্দের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা দেখার পারিশ্রমিক! বড়’ই কষ্টের কথা এক বছর অতিবাহিত হয়ে গেলো সিলেট শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের টাকা পেলাম না। এ ক্রান্তিলগ্নে টাকাগুলো পেলে উপকারে আসতো। আমরা জানি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার আগে উত্তরপত্র মূল্যায়নের টাকা আদায় করা হয়। মূল্যায়নের টাকা বোর্ড এক বছর পর্যন্ত ব্যাংকে জমা রাখে। আমাদেরকে এক বছর অপেক্ষায় না রেখে পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ হবার এক মাসের মধ্যে উত্তরপত্র মূল্যায়নের টাকা বিতরণ করা হোক।” এ আক্ষেপটি শুধু তাঁর একার নয় বরং সমগ্র শিক্ষক সমাজের। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও অনেকটা এরকম। আমার জানামতে  বিভিন্ন বোর্ডের ফলাফল প্রকাশের পরে সম্মানী দেয়া হলেও সিলেট বোর্ডে তা না হওয়াটা দুঃখজনক!
সম্ভাব্য একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। ২০১৯ সালে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৭৬ হাজার ২৫১ জন। মোট পরীক্ষার্থীর আনুমানিক ৮০ শতাংশ নিয়মিত পরীক্ষার্থী ধরলে সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৬১ হাজার  যাদের প্রায় সবাই ৭টি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে থাকে। এ হিসাবে মোট খাতার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ লক্ষ ২৭ হাজার টি। বাকি ২০ শতাংশ রেফার্ড পরীক্ষার্থীদের কমপক্ষে দু’টি বিষয় ধরলেও নিয়মিত এবং অনিয়মিত পরীক্ষার্থীর মোট খাতার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪ লক্ষ ৫৭ হাজার ৫০০ টি। ২৫ টাকা হারে সম্মানী দেয়া হলে আনুমানিক টাকার অংক দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ১৪ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা। এত টাকা যে কোনো ব্যাংকে জমা থাকলেই সর্বনিম্ন যদি ৫ শতাংশ সুদ পাওয়া যায় সে হিসেবে এক বছর টাকাগুলো ব্যাংকে রাখলে শুধু সুদের পরিমাণ হবে প্রায় ৬৮ লক্ষ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। শিক্ষকরা কিন্তু এ টাকার ভাগ পায় না বা দাবিও করেনা। এটা সম্ভাব্য, প্রকৃত সংখ্যা কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবেন। তবে বেশি ছাড়া কম হবেনা আশা রাখি।
ইনকাম ট্যাক্স কেটে রাখাকে আমি সাধুবাদ জানাই। এটি সরকারের সিদ্ধান্ত। যাদের বাৎসরিক ইনকাম ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার উপরে তাদের ইনকাম ট্যাক্স দেওয়া বাধ্যতামূলক। মহিলাদের ক্ষেত্রে সেটা ৩ লক্ষ টাকা। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এর কোন বিকল্প নেই। কিন্তু আমার জানামতে অনেক নন এমপিও শিক্ষক রয়েছেন যাদের বাৎসরিক ইনকাম ১ লক্ষ টাকারও কম তাদের থেকে ইনকাম ট্যাক্স কেটে রাখাটা আসলে কতটুকু আইনসিদ্ধ!  যাদের নিজের চলতে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা তাদের থেকে ইনকাম ট্যাক্স কেটে রাখাটা আমার মনে হয় বেমানান। আবার আমাদের ইনকাম ট্যাক্স কাটার কোন প্রমাণপত্রও পাঠানো হয় না। যে কারণে রিটার্ন দাখিল করার সময় প্রমানপত্রের অভাবে এ ইনকামের হিসাব রিটার্নে উল্লেখ করা যায় না বিধায় প্রকৃত হিসাবটিও পাওয়া যায় না। পেতে হলে শিক্ষাবোর্ড থেকে প্রমাণপত্র আনতে হয় যা আমাদের দূর-দূরান্তের বিশেষ করে হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের শিক্ষকদের ১০০০ টাকার প্রমাণপত্র আনতে প্রায় খরচ পড়বে ১০০০ টাকার!
আরেকটা ব্যাপার না বললেই নয়, আমাদের সিলেট শিক্ষাবোর্ড থেকে যারা উত্তরপত্র সংগ্রহ করেন তাদেরকে পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। একই দিনে প্রায় ১০০/১৫০ শিক্ষকদের মাঝে উত্তরপত্র বিতরণ করা হয়। বস্তা নিয়ে আসার জন্য শিক্ষকদের আগে থেকেই নির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে। একইসময়  উত্তরপত্র সংগ্রহ করতে কর্মচারিদের মুখের উপর তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকতে হয় শিক্ষকদেরকে! উত্তরপত্র সংগ্রহের পর সেগুলো নিজেই বস্তায় ঢুকিয়ে টেনেহেঁচড়ে গেটের বাইরে নিয়ে যানবাহন ম্যানেজ করার প্রতিযোগিতায় নামতে হয় জাতি গড়ার এই কারিগরদের। বিশেষ করে আমাদের মহিলা শিক্ষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয় চরমভাবে। তাদের পক্ষে টানাটানি করা অনেকটাই অসম্ভব হলেও প্রতিনিয়ত তাই করতে হয়। এক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেট আঞ্চলিক অফিসের অবস্থাটা একটু স্বস্তিদায়ক। সেখানে তিনদিন সময় দেয়া হয় এবং সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শিক্ষকরা যার যার মতো করে যেয়ে উত্তরপত্র সংগ্রহ করতে পারেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বস্তায় উত্তরপত্র আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে এবং তাদের কর্মচারিরাই যানবাহনে উঠানো পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে থাকে। শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বিতরণ পদ্ধতি অনুসরণ করার।
পরিশেষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতি গড়ার এ কারিগরদের যে সম্মানে দেখতে চেয়েছিলেন সে সম্মানের ধারা সমুজ্জ্বল রাখতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি। চলমান করোনা সংকট মোকাবেলায় ফ্রন্টলাইন যুদ্ধাদের বিশেষ করে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারিদের প্রতি থাকলো অশেষ শ্রদ্ধা। সরকারি নির্দেশনা মেনে মোরা, আমরা সবাই ঘরে থাকি। দেশটাকে ভালো রাখি। শুভকামনা নিরন্তর।
মো. শরীফ উদ্দিন
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
সরকারি কলেজ স্বাধীনতা শিক্ষক সমিতি
কেন্দ্রীয় কমিটি
01719375713
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Facebook Comments