বিশ্ব শিক্ষক দিবস এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব, অধিকার ও মর্যাদা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

264

বিশ্ব শিক্ষক দিবস এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব, অধিকার ও মর্যাদা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। মানুষই জীবজগতের একমাত্র প্রজাতি যারা knowledge অর্জন করে এবং সে knowledge কে বংশানুক্রমে হস্তান্তরিত করে। এভাবেই গড়ে উঠেছে মানব সভ্যতা। বংশ পরম্পরায় knowledge- সভ্যতা — সংস্কৃতি যাঁরা হস্তান্তর করে তাঁরাই হলেন শিক্ষক। সুতরাং সকল সভ্যদেশে শিক্ষকরাই সমাজে সর্বাধিক মর্যাদা ও অধিকার পেয়ে থাকে। শিক্ষকদের সম্পর্কে জাপানি প্রবাদে বলা হয়-“-Better than a thousand days of delight study is one day with a great teacher.” বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল এর মতে, “যারা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তাঁরা অভিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মানীয়”। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের মর্যাদার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। চিকিৎসাসেবা, ইন্জিনিয়ারিং, কৃষি, প্রশাসন, উকালতী ইত্যাদির ন্যায় শিক্ষকতাও একটি পেশা। এই পেশায় নিয়োজিত হওয়ার পুর্বে মানুষ সাধারনত দুটি দিক থেকে অনুপ্রাণিত হয়।
১.একটি চাকরি অথবা অর্থনৈতিক প্রবণতা ২.অন্যটি আদর্শিক বা ভাবপ্রবণতার দিক।

প্রথমটির মাধ্যমে তিনি চান অর্থ সম্পদ যার দ্বারা সাংসারিক জীবনে একদিকে যেমন সুখ ও সমৃদ্ধি লাভ করা যায় অন্যদিকে তেমনি তার সৎ ব্যবহারের দ্বারা জীবনে সম্মান ও গৌরবের সর্বোচ্চ স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠা অর্জন করা যায়। দ্বিতীয়টি দ্বারা তিনি চান সেবা ও আত্মনিয়োগ। যারা ২য় টি দ্বারা অনুপ্রাণিত হন তারা পার্থিব সুখ- সমৃদ্ধির দিকে আর্থিক মনোযোগী নন। ফলে উৎসর্গীকৃত জীবন যাপনে তারা আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। প্রকৃত আদর্শ শিক্ষক হতে হলে চাই আত্ম উৎসর্গ করার প্রেরণা। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়, “তিনিই সুশিক্ষক যিনি শিক্ষার্থীদের স্তরে নেমে আসতে পারেন এবং তাঁর নিজের আত্ম বাণী শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরটিকে নিজের অন্তর দিয়ে লম্বা করতে পারেন।” বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ” গায়ের জোরে সব হওয়া যায় গুরু হওয়া যায় না, গুরু হইতে গরিমা লাগে। এই গরিমা অর্জন করিতে হইলে শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিক্ষাদান কৌশল অবশ্যই তাঁহার জানা থাকিতে হইবে।” শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপুর্ণ। শিক্ষকেরা হচ্ছেন যে কোনো শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র এবং শিক্ষার মান, শিক্ষকের মান ও প্রচেষ্টার উপর নির্ভরশীল। তাই শিক্ষার সকল স্তরে উচ্চতর যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যাক্তিকে বাছাই করে নিতে না পারলে, তাদের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত না করলে কোনো কিছুই সফল হবে না।

দেশ জাতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নিবেদিত শিক্ষক সম্মানীয়, পূজনীয়, স্মরণীয় এবং চিরকাল হৃদয় সিংহাসনে বসিয়ে রাখার মতো গ্রহণীয়। এধরনের শিক্ষকদের কথা মাথায় রেখেই শিক্ষকদের অসামান্য অবদান এর স্বীকৃতি স্বরূপ তাদের স্মরণ করার জন্য UNESCO এর উদ্যোগে প্রতি বছর ৫ ই অক্টোবরকে নির্ধারণ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস হিসাবে। পৃথিবীর সব দেশের সব সমাজের কাছে এদিনটি অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার। শিক্ষক দিবস পালনের ইতিহাস খুব বেশি দিন আগের নয়। ১৯৯৩ সালে গঠিত হয় Education in International –EI নামক পৃথিবীব্যাপী আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠন। ১৬৭ টি দেশের ২১০ টি জাতীয় সংগঠনের প্রায় তিন কোটি বিশ লক্ষ সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী এই আন্তর্জাতিক সংগঠন আহবান জানায় শিক্ষক দিবস পালনের। এই আহবানের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে UNESCO এর ২৬ তম অধিবেশনের গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তৎকালীন মহাপরিচালক ড. ফ্রেডরিক এম মেয়ারের যুগান্তকারী ঘোষণার মাধ্যমে ১৯৯৫ সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর ১০০ টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদন্ড তবে শিক্ষক সে মেরুদন্ডের স্রস্টা। গোটা মনুষ্য সমাজের মধ্যে নৈতিক বিচারে শিক্ষকদের চেয়ে সম্মানিত এবং শিক্ষকতার চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পেশা আর কোথাও খুঁজে পাবে না কেউ। সে প্রেক্ষিতে এবছরের আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়টি খুবই তাৎপর্যমন্ডিত। তা হলো “Teacher: Leading crisis, reimagining the future.” অথার্ৎ — শিক্ষক : সংকটে নেতৃত্ব, নতুন করে ভবিষ্যতের ধারনা।” বিগত বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল–“The right to education means the right to a qualified teacher.” অর্থাৎ শিক্ষার অধিকার মানে যোগ্য শিক্ষকের অধিকার।

১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের ঘোষণাকে অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ ও সরকারের মধ্যে ঐক্য গড়ার মধ্য দিয়ে মান সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকেরা সমাজ রাষ্ট্রের আলোকবর্তিকার মতো কাজ করবে। বৈশ্বিক মহামারী করোনা সংকটে আমাদের শিক্ষক সমাজ নানান প্রতিকূলতার মাঝেও আগামী প্রজন্মকে একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ হাতে ডিজিটাল কন্টেন্ট বেইসড, জুম এ্যাপস্, গুগুলমিট, ফেসবুক লাইভ, মেসেঞ্জার, ইউটিউব চ্যানেল সহ বিভিন্ন মাধ্যমে শ্রেণি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে উদ্দীপনা ও সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তারপরও শিক্ষাক্ষেত্রে চরম বৈষম্য, সরকারি বেসরকারি শিক্ষকদের নানাবিধ সংকট এখনো বিরজমান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই শিক্ষার সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে শিক্ষকদের অধিকার মর্যাদা নিশ্চিত করনে ড. কুদরত ই খুদার নেতৃত্বে ১৮ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসকদের নিয়ে খুদা কমিশন গঠন করেছিলেন। শুধু তাই নয় তিনিই প্রথম সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রয়াত কবির চৌধুরীকে শিক্ষা সচিব নিয়োগ করেছিলেন। নিঃসন্দেহে শিক্ষকদের জন্য এটি গর্ব ও সম্মানের। তারই সুযোগ্যকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রিয় শিক্ষক প্রয়াত ড. আনিসুজ্জামান স্যার এবং প্রফেসর ড. রফিকুল ইসলামের প্রতি জাতীয় অনুষ্ঠানে যে সম্মান দেখাতেন তা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। স্যারগণ চেয়ারে না বসা পর্যন্ত তিনি বসতেন না। এতে আমরা শিক্ষক হিসাবে গর্ব অনুভব করি।বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি এমপিওভুক্ত একজন গর্বিত শিক্ষক মাতার আলোকিত সন্তান। সুতরাং তিনি যথাযত পদক্ষেপ নিবেন এ প্রত্যাশা আমাদের সকলের। সুদীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৮১ সালে আজকের প্রধানমন্ত্রী দেশে প্রত্যাবর্তন করে অপশক্তি ও সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহনণের পর জাতির জনকের স্বপ্ন সমূহকে বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

২০১০ সালে সর্বজন স্বীকৃত জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষণা করে সফল বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে কার্যক্রম শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষাকে পরিপূর্ণ জাতীয়করণ করেছেন। যে সকল উপজেলায় সরকারি মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ নেই সেগুলোতে ৩০০ টি স্কুল এবং ৩০২ টি কলেজ সরকারিকরণ করেন যা এখনো প্রক্রিয়াধীন। তারপরও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গড়িমশিতে এখনও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বহু টিচার অশ্রুসজল নয়নে অবসরে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক বেতন ভাতা না পেয়ে করোনাকালে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তাতে শিক্ষকদের মর্যদার হানি হচ্ছে। বিষয়টিতে যথাযত কতৃপক্ষের সুদৃঢ় পদক্ষেপ চাই। আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসে বলতে চাই বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছেন এবং তার সুযোগ্যকন্যা যেভাবে শিক্ষাকে সবার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তার সফল বাস্তবায়নে এদেশের শিক্ষক সমাজ কার্যকরী প্রচেষ্টা চালাবেন। আর তখনই মান সম্মত, প্রযুক্তিনির্ভর, গুনগত আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সফলতা অবশ্যই আসবে। আমরা দারুণভাবে আশাবাদী।

দেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ। বিশাল এই জনগোষ্ঠী দেশের সম্পদ। ILO– UNESCO ঘোষিত GDP এর ০৬ শতাংশ বাজেটে বরাদ্ধ আজ সময়ের দাবি। এখনও বাংলাদেশে শিক্ষার বাজেট ২-৩ শতাংশ যা দক্ষিন এশিয়ার সর্বনিম্নে। স্বাধীনতার পর আমরা অনেকদূর এগিয়েছি। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যাদের আমরা চালিকাশক্তি বলে থাকি সেই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পদমর্যাদার জন্য মাঠে নামতে হয়। অবশ্য এটা অনস্বীকার্য যে শুধু বেতন ভাতা বৃদ্ধি করলেই শিক্ষকেরা দক্ষ ও যোগ্য হয়ে উঠবেন তা নয়। তাদের যথাযত মর্যাদা ও সম্মান যদি দিতে না পারি তাহলে তাদের কাছ থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশা করা যুক্তি সংগত নয়। সম্মানিত শিক্ষকদের মনে রাখা দরকার শিক্ষকতার পেশা শুধু চাকরি নয়, শিক্ষকতা মহান ব্রত। শিক্ষকের আচার- আচরণ, ব্যাক্তিত্ব , আর্দশ, দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই সকলের নিকট অনুকরণীয়-অনুসরণীয় ও শিক্ষকসুলভ হতে হবে।

আমরা খুবই আশাবাদী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শিক্ষাবান্ধব সরকার বর্তমানে ক্ষমতাসীন এবং আগামীতে সে ধারা অব্যাহত থাকবে। জাতির পিতার সুযোগ্যকন্যা বাঙালি জাতির হাল ধরবেন অচিরেই এবং সকল সমস্যার সমাধান হবে। শিক্ষকদের অধিকার-মর্যাদা মুজিববর্ষে নিরসন হবে ইনশাল্লাহ্। তবেই লাল-সবুজের পতাকা খচিত মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশ কাঙ্খিত লক্ষ্যে উপনীত হবে। আজ এই দিবসে শিশু কিশোর দের স্বপ্নবোনার কারিগরদের সকল কে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। আসুন আপনাদের হৃদয়ের মনিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া শিক্ষকদের এই বিশেষ দিনে একটি সুন্দর শুভেচ্ছা কার্ড পাঠাই, দেখা করে আর্শীবাদ নিয়ে এক গুচ্ছ ফুল দিয়ে আসি কৃতজ্ঞচিত্তে। এই দিনে আমি শিরদাঁড়া উঁচু করে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের সঙ্গে সুর মিলিয়ে দৃঢ়কন্ঠে বলতে চাই, “শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার, দিল্লির পতি, সে তো কোন ছার। ভয় করি না’ক ধারি না’ক ধার মনে আছে মোর বল। বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাবো অনর্গল।যায় যাবে প্রাণ তাহে, প্রাণের চেয়ে মান বড়, আমি বুঝাবো শাহেনশাহে।”

লেখক – মোফাচ্ছের হোসাইন (জীবন)
নির্বাহী সভাপতি
সরকারি কলেজ স্বাধীনতা শিক্ষক সমিতি
কেন্দ্রীয় কমিটি।
01819874832

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Facebook Comments